মদ পান করা একটি কবীরা গুনাহ। এটি সকল অপকর্মের মূল। সকল অনিষ্টের চাবিকাঠি। এটি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অকেজো করে দেয়, অর্থ-সম্পদ ধ্বংস করে এবং মাথা ব্যথা সৃষ্টি করে। এর স্বাদ বিস্বাদ। এটি শয়তানের অন্যতম ঘৃণ্য কাজ। এটি মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ব্যভিচারের দিকে আহ্বান করে। হতে পারে নিজের মেয়ে, বোন এবং মাহরামদের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে প্রলুব্ধ করে। এটি গাইরত ধ্বংস করে দেয় এবং লাঞ্ছনা, আফসোস ও অপমানের কারণ হয়। এটি মদ্যপকে অপূর্ণ স্তরের মানুষে তথা পাগলদের স্তরে নিয়ে যায়। এটি গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয় এবং উহ্য বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেয়। মন্দ ও পাপ কাজে জড়ানোকে তুচ্ছ হিসেবে উপস্থাপন করে। মন থেকে সম্মানিত বিষয়কে সম্মান করার অনুভূতি দূর করে দেয়। মদে আসক্ত ব্যক্তি মূর্তিপূজারীর মতো।
এটি কত যুদ্ধের সূচনা যে করেছে? কত ধনী ব্যক্তিকে যে দরিদ্র করেছে? কত সম্মানিত ব্যক্তিকে যে অপমানিত করেছে? কত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে যে লাঞ্ছিত করেছে? কত নিয়ামত যে কেড়ে নিয়েছে? কত শাস্তি যে ডেকে এনেছে?
কত স্বামী আর স্ত্রীর মাঝে যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে? স্বামীর হৃদয় ও বিবেক-বুদ্ধি কেড়ে নিয়েছে।
কত যে আফসোস বা শিক্ষার কারণ হয়েছে?
মদ্যপ ব্যক্তির সামনে কল্যাণের কত দুয়ার যে রুদ্ধ করেছে এবং কত অনিষ্টের দুয়ার যে উন্মোচন করেছে?
কত বিপদে যে ফেলেছে, কত মৃত্যু যে ত্বরান্বিত করেছে?
মদ্যপ ব্যক্তির উপর কত আপদ যে ডেকে এনেছে?
সুতরাং মদ হলো পাপের সমষ্টি, অনিষ্টের চাবি, নিয়ামত লুণ্ঠনকারী এবং বিপদ আহ্বানকারী।
যদি মদের একটিমাত্র অনিষ্ট এটা হত যে, একই ব্যক্তির পেটে এই মদ ও জান্নাতের মদ একত্রিত হবে না, তাহলে মুসিবত হিসেবে এটাই যথেষ্ট ছিল।
আমরা যা উল্লেখ করলাম মদের অনিষ্ট তার চেয়ে বহুগুণে বেশি।[সমাপ্ত][ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ রচিত ‘হাদিউল আরওয়াহ’ গ্রন্থ থেকে চয়নকৃত]
আল্লাহ আমাদেরকে তার কিতাবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বচনের মাধ্যমে মদ থেকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
১- আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ। অতএব, এসব থেকে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”[সূরা মায়েদা: ৯০]
২- আল্লাহ তাআলা মদ্যপ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুনানে আবু দাউদে (৩১৮৯) রয়েছে: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মদ পানকারী, এর পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, উৎপাদক, যে উৎপাদন করায়, সরবরাহকারী এবং যার জন্য সরবরাহ করা হয়— এদেরকে সবাইকে আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন।”[হাদীসটি শাইখ আলবানী সহিহ বলে গণ্য করেছেন যেমনটি সহীহু আবু দাউদে (২/৭০০) রয়েছে]
৩- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্যপ ব্যক্তিকে মূর্তিপূজারীর সদৃশ বলে গণ্য করেছেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মদে আসক্ত ব্যক্তি মূর্তিপূজারীর মত।”[হাদীসটি ইবনে মাজাহ (৩৩৭৫) বর্ণনা করেছেন এবং শাইখ আলবানী সহীহু ইবনে মাজাহ (২৭২০) গ্রন্থে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন]
৪- যে ব্যক্তি নিয়মিত মদ পান করে তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা হারাম হয়ে যায়। আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মদে আসক্ত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”[হাদীসটি ইবনে মাজাহ (৩৩৭৬) বর্ণনা করেন এবং শাইখ আলবানী সহীহু ইবনে মাজাহ (২৭২১) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
৫- উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “তোমরা মদ পরিহার করো, কেননা তা সকল অপকর্মের প্রসূতি। তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে একজন ইবাদতগুজার ব্যক্তি ছিল। এক খারাপ রমণী তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এতদুদ্দেশ্যে মহিলাটি তার এক দাসীকে ইবাদতগুজার লোকের কাছে পাঠাল। দাসীটি এসে বলল: আমরা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আপনাকে ডাকছি। তখন ইবাদতগুজার লোকটি ঐ দাসীর সাথে গমন করলেন। দাসীটি যে দরজা অতিক্রম করত সেটিই পিছন থেকে বন্ধ করে দিত। এভাবে ইবাদতগুজার লোকটি এক সুন্দরী নারীর সামনে এসে উপস্থিত হলো। সে নারীর সন্নিকটে ছিল একটি ছেলে ও এক পেয়ালা মদ। সেই নারী ঐ ইবাদতগুজার লোককে বলল: আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি; বরং এজন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনি আমার সাথে কামে লিপ্ত হবেন কিংবা এই মদ পান করবেন কিংবা এই ছেলেকে হত্যা করবেন। লোকটি বলল: 'তাহলে আমাকে এই মদ থেকে এক গ্লাস দাও।’ মহিলাটি তাকে এক গ্লাস মদ পান করালো। এরপর লোকটি বলল: আরো দাও। এভাবে লোকটি থামল না। এক পর্যায়ে সে ঐ নারীর সাথে কুকামে লিপ্ত হলো এবং ঐ ছেলেকেও হত্যা করলো। অতএব তোমরা মদ পরিত্যাগ কর। কেননা, আল্লাহ্র শপথ! মদ ও ঈমান কখন সহাবস্থান করে না। এর একটি অন্যটিকে বের করে দেয়।”[হাদীসটি নাসাঈ (৫৬৬৬) বর্ণনা করেছেন। শাইখ আলবানী সহীহুন নাসাঈ (৫২৩৬) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন]
৬- মদ্যপ ব্যক্তির নামায চল্লিশ দিন কবুল হয় না। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মদ পান করে মাতাল হয় চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল হয় না। সে মারা গেলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর যদি সে তওবা করে তবে আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন। যদি সে আবার মদ পান করে মাতাল হয় তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'য়ালা তাকে 'রাদাগাতুল খাবাল' পান করাবেন। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! ‘রাদাগাতুল খাবাল’ কী?’ তিনি বললেন: জাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত।”[ইবনে মাজাহ (৩৩৭৭); শাইখ আলবানী সহীহু ইবনে মাজাহ (২৭২২) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলেছেন]
নামায কবুল হওয়ার অর্থ এই নয় যে তার নামায পড়া সঠিক নয় কিংবা তাকে নামায ছাড়তে হবে। বরং অর্থ হলো সে এর নেকী পাবে না। এ অবস্থায় নামায পড়ার ফায়দা হলো সে দায়মুক্ত হবে এবং নামায ত্যাগের দরুন শাস্তি পাবে না।
আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে নসর আল-মারওয়াযী বলেন: ‘তার নামায কবুল হবে না’ এর অর্থ হলো: মদ পান করার শাস্তি হিসেবে চল্লিশ দিন সে নামাযের কোনো নেকী পাবে না। যেমনিভাবে ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় জুমার দিন যে ব্যক্তি কথা বলবে, সে জুমা পড়লেও তার জুমা নাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ সে পাপের শাস্তি হিসেবে জুমার নেকী পাবে না।[তা’যীমু ক্বাদরিস সালাত: (২/৫৮৭, ৫৮৮)]।
ইমাম নববী বলেন: “তার নামায কবুল না হওয়ার অর্থ হলো এই নামাযগুলোতে সে কোনো নেকী পাবে না, যদিও তার ফরযের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে এবং তাকে পুনরায় নামায পড়তে হবে না।”[সমাপ্ত]
আর প্রশ্নকর্ত্রীকে যে বিষয়টি বলা হয়েছে যে, তার রোযা প্রত্যাখ্যান করা হবে এবং কবুল হবে না, সেটি মূলত কিছু আলেমের অভিমতের ভিত্তিতে। যারা মনে করেন উপর্যুক্ত হাদীসে উল্লিখিত নামায কবুল না হওয়ার দ্বারা অন্যান্য সকল ইবাদতও কবুল না হওয়াকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
মুবারকপুরী তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে বলেন: ‘কারো কারো মতে: নামাযের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কেননা এটি সর্বোত্তম শারীরিক ইবাদত। এটি কবুল না হলে অন্যান্য ইবাদত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কবুল হবে না।[সমাপ্ত] অনুরূপ কথা বলেছেন ইরাকী এবং মুনাওয়ী।
সুতরাং এই মতানুসারে রোযাও কবুল হবে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কেউ যদি মদ পান করে তাহলে সে রোযা রাখা ছেড়ে দিবে। বরং সে রোযার রাখার ব্যাপারে আদিষ্ট। কিন্তু শাস্তিস্বরূপ তার রোযা কবুল করা হবে না।
নিঃসন্দেহে মদ্যপ ব্যক্তিকে যথাসময়ে নামায আদায় করতে হবে এবং রমযানের রোযা রাখতে হবে। যদি সে তার কোনো নামায অথবা রোযা ছেড়ে দেয় তাহলে সে মদ পানের অপরাধের চেয়ে বড় কবীরা গুনাহতে জড়িয়ে পড়ল।
এটাও জেনে রাখা উচিত যে, কোনো মুসলিম পাপে লিপ্ত হওয়ার পর দুর্বল ঈমানের কারণে তাওবা করতে সক্ষম না হলেও তার জন্য পাপকাজ অনবরত চালিয়ে যাওয়া কিংবা ভালো কাজ ত্যাগ করা ও ভালো কাজের প্রতি অবহেলা করার দুয়ার যেন না খুলে দেয়। বরং তার উপর ওয়াজিব যথাসাধ্য ইবাদত করা এবং কবীরা গুনাহ ও ধ্বংসাত্মক গুনাহ ত্যাগে প্রচেষ্টা চালানো।
সুতরাং একজন মুসলিমের উপর ওয়াজিব আল্লাহকে ভয় করা এবং শয়তানের বিভ্রান্তি ও প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকা। সে যেন কোনোভাবে নিজেকে শয়তানের হাতের খেলনায় পরিণত না করে। আর তার শয়তান যদি তার উপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং তাকে স্রষ্টার অবাধ্যতায় লিপ্ত করায়, তাহলে সে যেন দ্রুত তাওবাহ করে। কেননা ‘পাপ থেকে তাওবাহকারী এমন ব্যক্তির মতো যার কোনো পাপ নেই।’[ইবনে মাজাহ (২৪৫০) হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং বূসীরী এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন ‘যাওয়াইদু ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে]
মদ্যপ ব্যক্তির এমন শাস্তি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে তাওবা করেনি। কিন্তু যে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন এবং তার আমল কবুল করবেন।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদেরকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।
সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য।