ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব
মঙ্গলবার, ২৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
২৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
শরিক হোন
মঙ্গলবার, ২৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
২৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
শরিক হোন

ইসলামে খাবার গ্রহণের শিষ্টাচারসমূহ

19

প্রশ্ন 13348

ইসলামে খাওয়ার শিষ্টাচারসমূহ কী কী?

উত্তরের সার-সংক্ষেপ

ইসলামে খাবার গ্রহণের শিষ্টাচারসমূহের মধ্যে রয়েছে: খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, আপ্যায়নকারী খাবার উপস্থাপন করলে অবিলম্বে তা গ্রহণ করা, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, নিজের কাছের অংশ থেকে খাওয়া, খাওয়ার পরে হাত ধোয়া, তিন আঙুল দিয়ে খাওয়া, পড়ে যাওয়া লোকমা তুলে নেওয়া, খাওয়ার সময় জরুরী প্রয়োজন ছাড়া থুতু এবং শ্লেষ্মা না ফেলা, খাদ্যের সমালোচনা না করা, খাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা, পেট ভর্তি না করা, স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে না খাওয়া; যেহেতু তা হারাম এবং খাওয়ার পরে আলহামদুলিল্লাহ বলা।

উত্তর

ইসলামী শরীয়তে খাবার গ্রহণের বেশ কিছু শিষ্টাচার রয়েছে। সে শিষ্টাচারগুলো কয়েকভাগে বিভক্ত:

খাওয়ার পূর্বের শিষ্টাচার

  • খাওয়ার আগে হাত ধোয়া: খাওয়ার আগে দুই হাত ধোয়া আবশ্যক; যাতে করে পরিষ্কার দুই হাত দিয়ে খেতে পারে এবং হাতের ময়লার কারণে নিজের ক্ষতি না করে।
  • খাওয়ার আরেকটি শিষ্টাচার হচ্ছে কেউ যদি কারো অতিথি হন এবং খাবারটা চিনতে না পারে (খাদ্যের প্রকার না জানে) এবং উপস্থাপিত খাদ্যে তার মন সায় না দেয়, তাহলে যেন এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা বা তাকে খাবারের নাম না বলার আগে খেতেন না। বুখারী খালেদ ইবনুল ওয়ালীদের সূত্রে বর্ণনা করেন: তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার খালা ও ইবনে আব্বাসের খালা মাইমূনার ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁর কাছে একটি ভুনা সান্ডা দেখতে পেলেন, যা নজদ থেকে তার (মাইমূনাহর) বোন হুফাইদা বিনতুল হারিস নিয়ে এসে ছিলেন। মাইমূনা রাদিয়াল্লাহু আনহা সান্ডাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পেশ করলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, কোন খাবারের বিবরণ দেয়া বা নাম বলার আগ পর্যন্ত তিনি খুব কমই কোনো খাবারের প্রতি হাত বাড়াতেন। তিনি সান্ডার দিকে হাত বাড়াতে চাইলে উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে একজন বলল: ‘তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত কর যে, তোমরা তাঁর সামনে যা পেশ করেছ সেটি সান্ডা।’ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত তুলে ফেললেন। খালিদ ইবনু ওয়ালীদ জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! সান্ডা খাওয়া কি হারাম?’ তিনি বললেন: “না। কিন্তু, এটি আমাদের এলাকায় নেই। তাই এটি খেতে আমার রুটি হয় না।” খালিদ বলেন: “আমি সেটি টেনে নিয়ে খেতে থাকলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে দেখছিলেন।[হাদীসটি বুখারী (৫৩৯১) ও মুসলিম (১৯৪৬) বর্ণনা করেন]

ইবনুত তীন বলেন: ‘তিনি জিজ্ঞাসা করতেন কেননা খাদ্যের অপ্রতুলতার কারণে আরবরা কোনো কিছুই খাওয়া অপছন্দ করত না। কিন্তু তিনি কিছু খাবার অপছন্দ করতেন। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করতেন। অন্য একটি সম্ভাবনাও থাকতে পারে যে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন এ কারণে যে, শরীয়তে কিছু প্রাণী খাওয়া হারাম, আর কিছু প্রাণী খাওয়া হালাল। কিন্তু, তারা কোনো পশুকে হারাম মনে করত না। হয়তো তারা ভুনা করে বা রান্না করে নিয়ে এসেছে যাতে করে জিজ্ঞাসা করা ছাড়া এটাকে চেনা সম্ভবপর নয়।’[ফাতহুল বারী (৯/৫৩৪)]

  • আপ্যায়নকারীর পক্ষ থেকে খাবার পেশ করার পর অবিলম্বে খাবার গ্রহণ করা: অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে অতি দ্রুত পরিবেশন করা। আর আপ্যায়নকারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে অবিলম্বে খাবার গ্রহণ করা ও পেশকৃত খাবার খাওয়া। আরবদের প্রথা ছিল তারা যদি অতিথিকে না খেতে দেখত তখন অতিথির প্রতি মন্দ ধারণা করত। তাই অতিথির উচিত আপ্যায়নকারীকে আশ্বস্ত রাখতে অবিলম্বে খাবার গ্রহণ করা। কারণ এতে করে আপ্যায়নকারী আশ্বস্ত থাকবেন।
  • খাওয়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা: খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। বিসমিল্লাহ (بِسْمِ اللهِ) পড়াকে আরবী সংক্ষেপে ‘তাসমিয়া’ বলা হয়। উম্মে কুলসূম রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যখন খেতে চাইবে তখন সে যেন (আগে) আল্লাহর নাম স্মরণ করে। যদি সে শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায় তাহলে যেন সে বলে: بِسْمِ الله أوَّلَهُ وآخِرَهُ  “শুরুতে ও শেষে বিসমিল্লাহ।”[হাদীসটি তিরমিযী (১৮৫৮), আবু দাউদ (৩৭৬৭) ও ইবনে মাজাহ (৩২৬৪) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহু সুনান আবি দাউদ’ (৩২০২) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]

দলিল হচ্ছে উমর ইবনে আবী সালামাহর বর্ণনা করেন। তিনি: আমি বাল্যকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিপালনে ছিলাম। সে সময় আমার হাত খাবারের বাসনে ছুটাছুটি করত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: “খোকা! ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাও, ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছের পার্শ্ব থেকে খাও।”[হাদীসটি বুখারী (৫৩৭৬) ও মুসলিম (২০২২) বর্ণনা করেন]

খাবার গ্রহণের সময়ের শিষ্টাচার

  • ডান হাতে খাওয়া: মুসলিমের উপর ডান হাতে খাওয়া এবং বাম হাতে না খাওয়া ওয়াজিব। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন বাম হাতে না খায় এবং বাম হাতে পান না করে। কারণ শয়তান বাম হাতে খায় ও বাম হাতে পান করে।”[হাদীসটি মুসলিম (২০২০) বর্ণনা করেন]

যদি ব্যক্তির কোনো ওজর না থাকে সেক্ষেত্রে এ হুকুম প্রযোজ্য। কিন্তু যদি ডান হাতে খাওয়া বা পান করার ক্ষেত্রে অসুস্থতা, অপারেশন বা অন্য কোনো ওজর থাকে সেক্ষেত্রে বাম হাতে খেতে কোনো সমস্যা নেই।

এ হাদীসটি এই ইঙ্গিত করছে যে মানুষের উচিত শয়তানের কাজকর্মের অনুরূপ কাজকর্ম পরিহার করা।

  • নিজের কাছের অংশ থেকে খাওয়া: সুন্নত হচ্ছে (সম্মিলিতভাবে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে) ব্যক্তি সরাসরি তার কাছের অংশ থেকে খাওয়া সুন্নত। অন্যের পাশের অংশ থেকে কিংবা খাবারের মাঝখানের দিকে হাত বাড়াবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনে আবী সালামাকে বলেন: ‘ওহে খোকা! তুমি বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাতে খাও এবং নিজের কাছের অংশ থেকে খাও।’[হাদীসটি বুখারী (৩৫৭৬) ও মুসলিম (২০২২) বর্ণনা করেন]

তাছাড়া কেউ তার সাথে বসা ব্যক্তির পাশ থেকে খাওয়া অসদাচরণ ও ব্যক্তিত্বহীনতা। হতে পারে সেই ব্যক্তি এটাকে নোংরা মনে করবে। বিশেষতঃ ঝোল-জাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে।

মাঝখান থেকে খাবার না খাওয়ার সপক্ষে দলিল হচ্ছে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “খাবারের মাঝখানে বরকত নাযিল হয়। তাই তোমরা এর চারপাশ থেকে খাও; মাঝখান থেকে খেয়ো না।”[হাদীসটি তিরমিযী (১৮০৫) ও ইবনে মাজাহ (৩২৭৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহুল জামে’ (৮২৯) গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেন]

তবে খাবার যদি খেজুর হয় কিংবা নানা জাতের হয় তাহলে খাবারের পাত্রের বিভিন্ন দিকে হাত যাওয়াকে ফকীহরা বৈধ বলে গণ্য করেন।

  • খাওয়ার পরে হাত ধোয়া: কেবল পানির মাধ্যমে হাত ধৌত করলে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা হয়ে যায়। ইবনে রাসলান বলেছেন: ‘উত্তম হলো ক্ষার, সাবান বা অনুরূপ বস্তু দিয়ে হাত ধোয়া।’[দেখুন: তুহফাতুল আহওয়াযী (৫/৪৮৫)]

ব্যক্তি যদি অযু অবস্থায়ও থাকে তবুও খাওয়ার আগে-পরে হাত ধোয়া মুস্তাহাব।

  • খাওয়ার পরে কুলি করা: খাওয়ার পরে কুলি করা মুস্তাহাব। দলিল হলো: সুয়াইদ ইবনুন নু’মান থেকে বশীর ইবনে ইয়াসার বর্ণনা করেন যে, একবার সাহাবীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ‘সাহবা’ নামক স্থানে ছিলেন। -'সাহবা' জায়গাটা ছিল খাইবার থেকে এক অপরাহ্ণের দূরত্বে-। তখন নামাযের সময় উপস্থিত হলো। তিনি খাবার আনতে বললেন। কিন্তু, ছাতু ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। ছাতু মুখে নিয়ে তিনি নাড়াচাড়া করলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে ছাতু মুখে নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম। তারপর তিনি পানি আনালেন এবং কুলি করলেন। তারপর নামায আদায় করলেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে নামায আদায় করলাম। কিন্তু, তিনি ওযু করলেন না।[হাদীসটি বুখারী (৫৩৯০) বর্ণনা করেন]
  • আপ্যায়নকারীর জন্য দোয়া করা। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে উবাদাহর দাওয়াতে গেলেন। সাদ রুটি ও তেল হাজির করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেয়ে তার জন্য দোয়া করলেন: أفْطَرَ عندَكم الصائِمونَ وأَكَلَ طعامَكم الأبْرارُ وصَلَّتْ عليكم الملائِكةُ  “আপনাদের কাছে রোযাদারেরা ইফতার করুন, সৎ লোকেরা আপনাদের খাবার গ্রহণ করুন এবং ফেরেশতারা আপনাদের জন্য রহমতের দু’আ করুন।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৮৫৪) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহ সুনান আবি দাউদ’ (৩২৬৩) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
  • তিন আঙুলে খাওয়া: তিন আঙুলে খাওয়া সুন্নাহ। ইয়াদ্ব বলেন: “তিনের চেয়ে বেশি আঙুল দিয়ে খাওয়া ভোজনলিপ্সা ও অশিষ্টাচার। আর যেহেতু এটা করা নিষ্প্রয়োজন। কারণ খাবার গ্রহণকারী তিন আঙুল দিয়ে তিন দিক থেকে লোকমাকে ধরতে পারে। তবে যদি খাবার হালকা হওয়ার কারণে তিনের বেশি আঙুল দিয়ে খাবার ধরার প্রয়োজন হয় তাহলে চতুর্থ বা পঞ্চম আঙুলের সাহায্য নিবে।”[দেখুন: ফাতহুল বারী (৯/৫৭৮)]

কেউ যদি হাত দিয়ে খায়, তাহলে এই বিধান। তবে চামচ বা অনুরূপ বস্তু ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই।

  • পড়ে যাওয়া খাবার খাওয়া: লোকমা পড়ে গেলে খাদ্যগ্রহণকারী ব্যক্তির উচিত ঐ খাবার থেকে ময়লা দূর করে তা খেয়ে নেওয়া; শয়তানের জন্য রেখে না দেওয়া। কারণ সে জানে না তার খাবারের কোন অংশে বরকত আছে। হয়তো পড়ে যাওয়া অংশে বরকত আছে। ফলে এটি পরিত্যাগ করার কারণে ব্যক্তি খাবারের বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো খাবার খেলে তিন আঙুল চেটেপুটে খেতেন এবং বলতেন: “তোমাদের কারো কোনো লোকমা পড়ে গেলে সে যেন এর থেকে ময়লা দূর করে এবং এটি খেয়ে নেয়। শয়তানের জন্য যেন রেখে না দেয়।” এছাড়া তিনি আমাদেরকে বাসন মুছে খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমরা জানো না কোন খাবারে বরকত আছে।”[হাদীসটি মুসলিম (২০৩৪) বর্ণনা করেন]
  • খাবার খাওয়ার সময় ঠেস দিয়ে না বসা: কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আমি হেলান দিয়ে খাবার খাই না।" [সহিহ বুখারী, ৫৩৯৯)। ‘ঠেস দেওয়া’ বা ‘ইত্তিকা’ বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়ে আলেমগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। ইবনে হাজার (রহ.) বলেন: ‘ঠেস দেওয়া’র অর্থ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো যে কোনোভাবে আসন গেড়ে বসে খাবার খাওয়া। কেউ বলেছেন, এর অর্থ একপাশে কাত হয়ে বসা। আবার কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো বাম হাত মাটিতে রেখে হাতের ওপর ভর দিয়ে বসা...। ইবনে আদী একটি যঈফ (দুর্বল) সনদে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে খাওয়ার সময় বাম হাতের ওপর ভর দিয়ে বসা অবস্থায় দেখে তিরস্কার করেছিলেন। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, এটিও এক প্রকারের ‘ঠেস দেওয়া’। আমি (ইবনে হাজার) বলব: এটি নির্দেশ করে যে ইমাম মালিক খাওয়ার সময় এমন সবকিছুকেই ‘মাকরুহ’ মনে করতেন যেগুলোকে ‘ঠেস দেওয়া’ হিসেবে গণ্য করা যায় এবং এটি নির্দিষ্ট কোনো এক পদ্ধতির সাথে খাস নয়। (ফাতহুল বারী, ৯/৫৪১)
  • খাওয়ার সময় জরুরী প্রয়োজন ছাড়া থুতু বা শ্লেষ্মা না ফেলা।
  • খাওয়ার আরও কিছু শিষ্টাচার হলো: সবাই একসাথে সাথে খাওয়া। খাওয়ার সময় হারাম নয় এমন সব কথাবার্তা বলা। ছোট বাচ্চা ও স্ত্রীদেরকে খাইয়ে দেয়া। অসুস্থতা জাতীয় ওজর ছাড়া কোনো খাবার একাকী না খাওয়া। বরং ভালো খাবারগুলো নিজের পরিবর্তে তাদেরকে দেওয়া। যেমন: ভালো মাংসের টুকরো, নরম কিংবা উত্তম রুটি। অতিথি খাবার শেষ করে হাত উঠিয়ে ফেললেও আপ্যায়নকারী বলবেন: আরো খান। বারংবার তাকে এটি বলবেন যতক্ষণ না তিনি নিশ্চিত হন যে অতিথি আর খাবে না। তিন বারের বেশি বলবে না। (খাবারের পর) দাঁত খিলাল করবে এবং সেখান থেকে যা বের হবে তা না গিলে বরং ফেলে দিবে।

খাওয়ার পরের শিষ্টাচার

খাওয়া শেষ করার পরে আল্লাহর প্রশংসা হিসেবে যে যিকির বর্ণিত হয়েছে তা পড়া সুন্নত। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখান তুলে নেয়া হত তখন তিনি বলতেন: الْحَمْدُ لله حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ غَيْرَ مَكْفِيٍّ وَلاَ مُوَدَّعٍ وَلاَ مُسْتَغْنًى عَنْه رَبَّنَا  “পবিত্র বরকতময় অসংখ্য প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে আমাদের প্রভু! (আমরা) প্রশংসা করছি এমতাবস্থায় যে, অমুখাপেক্ষী হয়ে নয়, আপনাকে বিদায় জানিয়ে নয় ও বিমুখ হয়েও নয়।”[হাদীসটি বুখারী (৫৪৫৮) বর্ণনা করেন] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ ছাড়া অন্য খাবার খেলে বলতেন: اللهمَّ بارِكْ لنا فِيْهِ وأطْعِمْنا خَيْراً مِنْهُ  “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এতে বরকত দিন এবং আমাদেরকে এর চেয়ে ভালো কিছু খাওয়ান।” আর দুধ পান করলে বলতেন: اللهمّ بارِكْ لنا فِيْهِ وزِدْنا مِنْهُ  “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এ খাবারে বরকত দিন এবং এই খাবার আরও বাড়িয়ে দিন।”[হাদীসটি তিরমিযী (৩৩৭৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহুল জামে’ গ্রন্থে (৩৮১) হাদীসটিকে হাসান বলেন]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ যাকে কোনো খাবার খাওয়ায় সে যেন বলেন: হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এ খাবারে বরকত দিন এবং আমাদেরকে এর থেকে ভালো কিছু খাওয়ান। আর আল্লাহ যাকে দুধ পান করায় সে যেন বলে: হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এ খাবারে বরকত দিন এবং এ খাবার আরও বাড়িয়ে দিন।”[হাদীসটি তিরমিযী (৩৪৫৫) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহ সুনানিত তিরমিযী (২৭৪৯) গ্রন্থে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন]

খাওয়ার কিছু সাধারণ শিষ্টাচার

  • খাবারের নিন্দা না করা। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো খাবারের নিন্দা করেননি। তার পছন্দ হলে সেটি খেয়েছেন। আর অপছন্দ হলে তা পরিত্যাগ করেছেন।”[হাদীসটি বুখারী (৩৩৭০) ও মুসলিম (২০৪৬) বর্ণনা করেন] এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুবাহ তথা বৈধ খাবার। বিপরীতে তিনি হারাম খাবারের ত্রুটি তুলে ধরতেন, নিন্দা করতেন এবং তা খেতে নিষেধ করতেন।

ইমাম নববী বলেন: ‘খাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হলো ত্রুটি না ধরা। যেমন: লবণ বেশি, তিতা, লবণ কম, ঘন, পাতলা, অসিদ্ধ ইত্যাদি না বলা। ইবনে বাত্তাল বলেন: এটি উত্তম শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। কারণ হয়তো কেউ এক খাবার পছন্দ করে না; কিন্তু অন্য ব্যক্তি সেই খাবার পছন্দ করে। আর শরীয়ত যা কিছু খাওয়ার অনুমতি দিয়েছে তাতে কোনো ত্রুটি নেই।’[শরহে মুসলিম (১৪/২৬)]

  • খাওয়ার আরও একটি শিষ্টাচার হচ্ছে (খাবার গ্রহণে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা এবং পেট ভরে না খাওয়া। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ যা বৈধ তা হলো মুসলিম তার পেটকে তিন ভাগে ভাগ করবে: এক ভাগ খাবারের জন্য, এক ভাগ পানীয়ের জন্য এবং এক ভাগ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। কেননা হাদীসে আছে: “কোন মানুষ পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি। মানুষের জন্য তার মেরুদণ্ড সোজা (শক্ত) রাখার জন্য কয়েক গ্রাসই যথেষ্ট। যদি বেশি খেতেই হয়, তাহলে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য হওয়া উচিত।”[হাদীসটি তিরমিযী (২৩৮০) ও ইবনে মাজাহ (৩৩৪৯) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযী (১৯৩৯)-এ হাদীসটি সহিহ বলে গণ্য করেন] এছাড়াও শরীর মাঝারি ও হালকা গড়নে রাখার জন্য এমনটি করা উচিত। কেননা পেট ভরে খেলে শরীর ভারী হয়ে যায়। এতে করে ইবাদতে ও কাজে অলসতা তৈরি হয়। এক-তৃতীয়াংশ জানার উপায় হলো: যতটুকু খেলে তার পেট ভরে এর তিন ভাগের এক ভাগ।’[আল-মাউসুয়া (২৫/৩৩২)]
  • স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকা। কারণ এটি হারাম। দলিল হচ্ছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা পাতলা রেশমী বস্ত্র ও মোটা রেশমী বস্ত্র পরবে না, সোনা ও রূপার বাসনে পান করবে না এবং সোনা রূপার থালায়ও খাবে না। কেননা পৃথিবীতে এগুলো তাদের (কাফিরদের) জন্য। আর আখিরাতে আমাদের জন্য।”[হাদীসটি বুখারী (৫৪২৬) ও মুসলিম (২০৬৭) বর্ণনা করেন]
  • খাওয়ার পরে আল্লাহর প্রশংসা করা। এটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা ঐ বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, যে খাবার খেয়ে সেটার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে অথবা পানীয় পান করে সেটার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে।”[হাদীসটি মুসলিম (২৭৩৪) বর্ণনা করেন]

খাওয়ার পরে আল্লাহর প্রশংসার বিভিন্ন শব্দরূপ:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে খাওয়ার পরে আল্লাহর প্রশংসার বিভিন্ন শব্দরূপ বর্ণিত হয়েছে:

  • আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখান তুলে নেয়া হত তখন তিনি বলতেন: الْحَمْدُ لله حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ غَيْرَ مَكْفِيٍّ وَلاَ مُوَدَّعٍ وَلاَ مُسْتَغْنًى عَنْه رَبَّنَا “পবিত্র বরকতময় অসংখ্য প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে আমাদের প্রভু! (আমরা) প্রশংসা করছি এমতাবস্থায় যে, অমুখাপেক্ষী হয়ে নয়, আপনাকে বিদায় জানিয়ে নয় এবং আপনার থেকে বিমুখ হয়েও নয়।”[হাদীসটি বুখারী (৫৪৫৮) বর্ণনা করেন]

ইবনে হাজার বলেন: “তার বাণী: غَيْرَ مَكْفِيٍّ  এর অর্থ সম্পর্কে কেউ বলেছেন: غير محتاج إلى أحد من عباده لكنه هو الذي يطعم عباده ويكفيهم (তিনি তাঁর কোনো বান্দার মুখাপেক্ষী নন। বরঞ্চ তিনিই তার বান্দাদেরকে খাওয়ান এবং প্রয়োজন পূরণ করেন। তার বাণী: ولا مودع (বিদায় জানিয়ে নয়) এর অর্থ غير متروك  অর্থাৎ ছেড়ে দিয়ে নয়।’

  • মুয়ায ইবনে আনাস তার পিতা বর্ণনা করেন তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কেউ যদি কোনো খাবার খেয়ে বলে: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ  (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এ খাদ্য খাওয়ালেন এবং এ রিযিক দান করলেন আমার পক্ষ হতে কোনো চেষ্টা ও ক্ষমতা প্রয়োগ ছাড়া’ তাহলে তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।”[হাদীসটি তিরমিযী (৩৪৫৮) ও ইবনে মাজাহ (৩২৮৫) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহুত তিরমিযী’ (৩৩৪৮) গ্রন্থে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন]
  • আবু আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়া কিংবা পান করার পর বলতেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيأَطْعَمَ وَسَقَى وَسَوَّغَهُ وَجَعَلَ لَهُ مَخْرَجًا  “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি খাওয়ালেন, পান করালেন, পেটে প্রবেশ করা সহজ করে দিলেন এবং এগুলো বের হওয়ারও পথ রাখলেন।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৮৫১) বর্ণনা করেন এবং শাইখ আলবানী এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
  • আব্দুর রহমান ইবনে জুবাইর বলেন: আট বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করেছেন এমন এক ব্যক্তি তাকে বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খাবার এগিয়ে দেওয়া হলে তিনি তাকে বলতে শুনতেন: বিসমিল্লাহ। খাওয়া শেষ হলে তিনি বলতেন: اللهمَّ أطعَمْتَ و أسْقَيْتَ، وَهَدَيْتَ وأحْيَيْتَ، فَلَكَ الحمْدُ على ما أعْطَيْتَ  “হে আল্লাহ! আপনি খাবার খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। আপনি যা দিয়েছেন তার জন্য আপনার প্রশংসা।”[হাদীসটি আহমদ (১৬১৫৯) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সিলসিলা সহীহাহ’ (১/১১১) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]

টীকা: খাবার খাওয়ার পর আল্লাহর প্রশংসাবহ সবগুলো বাণী পড়া মুস্তাহাব। কখনো এটি পড়বে, কখনো অন্যটি পড়বে; যাতে করে সব দিক থেকে সুন্নাহ সংরক্ষিত হয় এবং এই দোয়াগুলোর বরকত পায়। অধিকন্তু কখনো এই বাক্যগুলো আবার কখনো ঐ বাক্যগুলো বলার মাধ্যমে ব্যক্তি মনের ভেতর দোয়াগুলোর ভাব স্মরণ হওয়া অনুভব করতে পারবে। কেননা মানুষের মন যদি একটি যিকিরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে বারবার পড়ার কারণে দোয়াটির ভাব সে খুব কম সময়ই স্মরণে আনতে পারে।[শালহূবের ‘আল-আদাব’ (পৃ. ১৫৫) গ্রন্থ থেকে সমাপ্ত]

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

পানাহারের শিষ্টাচার

সূত্র: 

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

App StoreGoogle Play